চাঁপাইনবাবগঞ্জের দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সোনামসজিদ স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। চার বছর আগেও ফল, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, মসলা, মাছ, কসমেটিকস, ভুট্টা ও ভুসিসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানিতে ব্যস্ত থাকা বন্দরটিতে বর্তমানে পাথর ছাড়া প্রায় কোনো পণ্যই আমদানি হচ্ছে না।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতা, অতিরিক্ত কড়াকড়ি, শুল্ক নির্ধারণ ও পণ্য মূল্যায়নে বৈষম্য এবং দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকটের কারণে তারা এ বন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এর প্রভাব পড়েছে বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। কর্মসংস্থান হারিয়ে শত শত শ্রমিক বেকার ও ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন বলে তারা জানান। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আদায়ও কমেছে।
বন্দরটির বর্তমান পরিস্থিতি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাস্টমসের নীতি এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবকে বন্দরের গতি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন আমদানিকারকরা। তাদের অভিযোগ, বন্দর পরিচালনা ও রাজস্ব আদায় নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় বা বৈঠক হয় না। ফল, জিরাসহ বেশি রাজস্ব আসে এমন মসলাজাতীয় পণ্যের শুল্কায়নে কর নির্ধারণ ও মূল্যায়ন নিয়ে কাস্টমসের সঙ্গে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। ফলে একই পণ্য অন্য বন্দরে সহজে খালাস হলেও সোনামসজিদে এসে ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়ছেন। এ কারণে অনেকে হিলি ও ভোমরা বন্দরের দিকে ঝুঁকছেন।
বন্দরসংলগ্ন নিজস্ব কাস্টমস হাউস না থাকাকেও সংকটের বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন ব্যবসায়ীরা। প্রশাসনিক বা রাজস্বসংক্রান্ত কোনো সমস্যা দেখা দিলে তাদের রাজশাহীতে যেতে হয়। অন্যদিকে সোনামসজিদের পরে বন্দর হিসেবে অনুমোদন পাওয়া ভোমরায় কাস্টমস হাউস থাকায় সেখানে রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত কার্যক্রম চালু থাকে এবং আমদানি দিন দিন বাড়ছে। সোনামসজিদে প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।
তবে ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতার অভিযোগ নাকচ করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। তাদের বক্তব্য, অসহযোগিতা নয়, নজরদারি বেড়েছে। সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবসা করতে আগ্রহীদের জন্য কোনো সমস্যা নেই এবং বর্তমানে বন্দরে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আমদানিকারক ও রিয়াদ ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মিজান বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দরে পাথর ছাড়া অন্য কোনো ব্যবসা হচ্ছে না। পানামার ভেতরও খালি পড়ে থাকে এবং আগের মতো গাড়ি আসছে না। এতে বন্দরে কর্মরত অনেক শ্রমিক এখন বসে আছেন। তাদের অনেকে ঋণগ্রস্ত ও অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। সরকারের প্রতি বন্দরটির দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, উদ্যোগ নেওয়া হলে সোনামসজিদকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মেসার্স তুহিন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী তুহিন আলম বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দরে আগের মতো ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নেই। একসময় ফল, মাছ, ভুসি, ভুট্টা, কসমেটিকস ও মসলাজাতীয় পণ্য আমদানি হলেও বর্তমানে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব, আমদানিকারকদের সঙ্গে কাস্টমস হাউসের বৈঠক না হওয়া এবং সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ না থাকায় বন্দরটি ঝিমিয়ে পড়েছে। কাস্টমস হাউস না থাকায় ব্যবসায়ীরা হিলি ও ভোমরার দিকে চলে যাচ্ছেন এবং এতে সোনামসজিদ রাজস্ব হারাচ্ছে বলে তিনি জানান।
তুহিন আলম বলেন, বন্দরে একটি কাস্টমস হাউস স্থাপন করা জরুরি। পোর্টসংক্রান্ত সমস্যা হলে ব্যবসায়ীদের রাজশাহী যেতে হয়। অন্যদিকে ভোমরায় কাস্টমস হাউস থাকায় রাত ৮টা বা ১০টা পর্যন্ত বন্দর খোলা থাকে এবং সেখানে ব্যবসায়ীরা নিজেদের সমস্যার কথা জানাতে পারেন। ফলে সোনামসজিদের ব্যবসা অন্য বন্দরে চলে যাচ্ছে।
সোনামসজিদ স্থলবন্দরের আমদানি ও রপ্তানিকারক গ্রুপের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে এবং গতি অনেক কমেছে। এতে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি শ্রমিকসহ বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকারের কাছে বন্দরটিতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা সরকারকে রাজস্ব দিতে প্রস্তুত। ফল, জিরাসহ মসলাজাতীয় পণ্যের আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ও কমেছে।
আরেক আমদানিকারক সাঈদ বলেন, বর্তমানে পাথর ছাড়া অন্য কোনো পণ্য তেমন আসছে না। তার অভিযোগ, করের তারতম্য এবং পণ্যের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে সমস্যা থাকায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তার ভাষ্য, একজন আমদানিকারক করের ভিন্নতার কারণে এক জায়গায় পণ্য কিনে অন্য জায়গায় বিক্রি করতে সমস্যায় পড়েন। কাস্টমসের কারণে রাজস্ব ঘাটতি হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, অন্যান্য বন্দরের মতো সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলে অন্যান্য পণ্যের আমদানিও বাড়বে। কেন সোনামসজিদে অন্য বন্দরের মতো কার্যক্রম চলছে না, তা তদন্তেরও দাবি জানান তিনি।
সাঈদ আরও বলেন, বন্দরকে কার্যকর করতে কাস্টমস হাউস প্রয়োজন। দেশের দ্বিতীয় স্থলবন্দর হলেও সোনামসজিদ এখনো কাস্টমস হাউস পায়নি। তার দাবি, ভোমরায় কাস্টমস হাউস স্থাপনের পর সেখানে গাড়ির সংখ্যা প্রায় চার গুণ বেড়েছে। সোনামসজিদেও কাস্টমস হাউস হলে গাড়ির সংখ্যা চার থেকে পাঁচ গুণ বাড়তে পারে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, রাজস্ব আদায়ের দিক থেকে সোনামসজিদ স্থলবন্দর একসময় বেনাপোলের পর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। ভৌগোলিক কারণ ও নেতৃত্বের কারণে এখানকার রাজস্ব কমছে এবং বন্দরটি ব্যর্থতার দিকে যাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তার মতে, সোনামসজিদ এলাকায় কাস্টমস কর্মকর্তাদের আবাসন না থাকাও বড় সমস্যা। কর্মকর্তারা শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী থেকে যাতায়াত করেন। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বন্দর চালু থাকার কথা থাকলেও এখানে কর্মকর্তারা সকাল ৯টা, ১০টা বা ১১টার দিকে আসেন এবং সড়কপথে নিরাপত্তার কারণে বিকেল ৪টার পর দ্রুত ফেরার প্রস্তুতি নেন বলে তিনি জানান।
আব্দুল ওয়াহেদ আরও বলেন, অন্যান্য বন্দরে ফলের গাড়িতে ছাড় দেওয়া হলেও সোনামসজিদে কাস্টমস তা অনুসরণ করে না এবং অসহযোগিতা করে। রাজশাহীর কাস্টমসের যে কাঠামো রয়েছে, সেটি সোনামসজিদে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সহায়ক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বন্দরসংক্রান্ত সমস্যা ও ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করতে সরকার সীমান্ত বাণিজ্য কমিটি গঠন করেছে এবং দুই মাস পরপর ওই কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও রাজশাহী কাস্টমস কমিশনার এসব বৈঠক ঠিকমতো করেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার মতে, অন্যান্য বন্দরের সুযোগ-সুবিধা সোনামসজিদেও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি জানান, কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য ৩২০ কোটি টাকার ‘সাসেক’ নামের একটি প্রকল্প একনেকে আটকে আছে বা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে সোনামসজিদের অবকাঠামো ও কাস্টমস হাউসসহ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো এর আওতায় আসবে। তার দাবি, এসব অবকাঠামো তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বন্দরের রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব হবে না।
একই সঙ্গে অবৈধভাবে ব্যবসার চেষ্টা থেকে সরে এসে বৈধ পথে ব্যবসা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন আব্দুল ওয়াহেদ। এ জন্য বিজিবি, কাস্টমস, এনএসআই, ডিজিএফআই, আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, এভাবে কাজ করা গেলে সোনামসজিদ স্থলবন্দরের ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানো সম্ভব।
সোনামসজিদ স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা রাজু মিয়া জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরটি থেকে ৮১৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আদায় হয়েছিল ৯০৯ কোটি টাকা। দুই অর্থবছরের মধ্যে রাজস্ব আদায়ের ব্যবধান প্রায় ৯০ কোটি টাকা, যা শতকরা হিসাবে ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ ঘাটতি।
রাজু মিয়ার ভাষ্য, রাজস্ব কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। আমদানি কমে যাওয়া এবং আমদানি শুল্ক কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে রাজস্ব ঘাটতি হয়। আগে সোনামসজিদ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি হলেও নানা কারণে কিছু পণ্যের আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়েও এর প্রভাব পড়েছে।
ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতার কারণে রাজস্ব কমেছে, এমনটি বলা যাবে না উল্লেখ করে রাজু মিয়া বলেন, তবে বন্দরে নজরদারি বেড়েছে। কমিশনারের নির্দেশনা অনুযায়ী যারা সঠিকভাবে ও সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবসা করছেন, তাদের স্বাগত জানানো হচ্ছে। ভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যবসা করতে চাওয়া ব্যক্তিদের সেই সুযোগ কমে যাওয়ায় রাজস্বে প্রভাব পড়তে পারে। তবে তার দাবি, বর্তমানে সোনামসজিদ স্থলবন্দরে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ রয়েছে এবং সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবসায়ীরা কার্যক্রম চালাতে পারছেন।

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ আগস্ট ২০২৬
চাঁপাইনবাবগঞ্জের দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সোনামসজিদ স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। চার বছর আগেও ফল, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, মসলা, মাছ, কসমেটিকস, ভুট্টা ও ভুসিসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানিতে ব্যস্ত থাকা বন্দরটিতে বর্তমানে পাথর ছাড়া প্রায় কোনো পণ্যই আমদানি হচ্ছে না।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতা, অতিরিক্ত কড়াকড়ি, শুল্ক নির্ধারণ ও পণ্য মূল্যায়নে বৈষম্য এবং দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকটের কারণে তারা এ বন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এর প্রভাব পড়েছে বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। কর্মসংস্থান হারিয়ে শত শত শ্রমিক বেকার ও ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন বলে তারা জানান। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আদায়ও কমেছে।
বন্দরটির বর্তমান পরিস্থিতি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাস্টমসের নীতি এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবকে বন্দরের গতি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন আমদানিকারকরা। তাদের অভিযোগ, বন্দর পরিচালনা ও রাজস্ব আদায় নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় বা বৈঠক হয় না। ফল, জিরাসহ বেশি রাজস্ব আসে এমন মসলাজাতীয় পণ্যের শুল্কায়নে কর নির্ধারণ ও মূল্যায়ন নিয়ে কাস্টমসের সঙ্গে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। ফলে একই পণ্য অন্য বন্দরে সহজে খালাস হলেও সোনামসজিদে এসে ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়ছেন। এ কারণে অনেকে হিলি ও ভোমরা বন্দরের দিকে ঝুঁকছেন।
বন্দরসংলগ্ন নিজস্ব কাস্টমস হাউস না থাকাকেও সংকটের বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন ব্যবসায়ীরা। প্রশাসনিক বা রাজস্বসংক্রান্ত কোনো সমস্যা দেখা দিলে তাদের রাজশাহীতে যেতে হয়। অন্যদিকে সোনামসজিদের পরে বন্দর হিসেবে অনুমোদন পাওয়া ভোমরায় কাস্টমস হাউস থাকায় সেখানে রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত কার্যক্রম চালু থাকে এবং আমদানি দিন দিন বাড়ছে। সোনামসজিদে প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।
তবে ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতার অভিযোগ নাকচ করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। তাদের বক্তব্য, অসহযোগিতা নয়, নজরদারি বেড়েছে। সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবসা করতে আগ্রহীদের জন্য কোনো সমস্যা নেই এবং বর্তমানে বন্দরে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আমদানিকারক ও রিয়াদ ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মিজান বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দরে পাথর ছাড়া অন্য কোনো ব্যবসা হচ্ছে না। পানামার ভেতরও খালি পড়ে থাকে এবং আগের মতো গাড়ি আসছে না। এতে বন্দরে কর্মরত অনেক শ্রমিক এখন বসে আছেন। তাদের অনেকে ঋণগ্রস্ত ও অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। সরকারের প্রতি বন্দরটির দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, উদ্যোগ নেওয়া হলে সোনামসজিদকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মেসার্স তুহিন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী তুহিন আলম বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দরে আগের মতো ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নেই। একসময় ফল, মাছ, ভুসি, ভুট্টা, কসমেটিকস ও মসলাজাতীয় পণ্য আমদানি হলেও বর্তমানে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব, আমদানিকারকদের সঙ্গে কাস্টমস হাউসের বৈঠক না হওয়া এবং সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ না থাকায় বন্দরটি ঝিমিয়ে পড়েছে। কাস্টমস হাউস না থাকায় ব্যবসায়ীরা হিলি ও ভোমরার দিকে চলে যাচ্ছেন এবং এতে সোনামসজিদ রাজস্ব হারাচ্ছে বলে তিনি জানান।
তুহিন আলম বলেন, বন্দরে একটি কাস্টমস হাউস স্থাপন করা জরুরি। পোর্টসংক্রান্ত সমস্যা হলে ব্যবসায়ীদের রাজশাহী যেতে হয়। অন্যদিকে ভোমরায় কাস্টমস হাউস থাকায় রাত ৮টা বা ১০টা পর্যন্ত বন্দর খোলা থাকে এবং সেখানে ব্যবসায়ীরা নিজেদের সমস্যার কথা জানাতে পারেন। ফলে সোনামসজিদের ব্যবসা অন্য বন্দরে চলে যাচ্ছে।
সোনামসজিদ স্থলবন্দরের আমদানি ও রপ্তানিকারক গ্রুপের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে এবং গতি অনেক কমেছে। এতে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি শ্রমিকসহ বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকারের কাছে বন্দরটিতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা সরকারকে রাজস্ব দিতে প্রস্তুত। ফল, জিরাসহ মসলাজাতীয় পণ্যের আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ও কমেছে।
আরেক আমদানিকারক সাঈদ বলেন, বর্তমানে পাথর ছাড়া অন্য কোনো পণ্য তেমন আসছে না। তার অভিযোগ, করের তারতম্য এবং পণ্যের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে সমস্যা থাকায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তার ভাষ্য, একজন আমদানিকারক করের ভিন্নতার কারণে এক জায়গায় পণ্য কিনে অন্য জায়গায় বিক্রি করতে সমস্যায় পড়েন। কাস্টমসের কারণে রাজস্ব ঘাটতি হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, অন্যান্য বন্দরের মতো সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলে অন্যান্য পণ্যের আমদানিও বাড়বে। কেন সোনামসজিদে অন্য বন্দরের মতো কার্যক্রম চলছে না, তা তদন্তেরও দাবি জানান তিনি।
সাঈদ আরও বলেন, বন্দরকে কার্যকর করতে কাস্টমস হাউস প্রয়োজন। দেশের দ্বিতীয় স্থলবন্দর হলেও সোনামসজিদ এখনো কাস্টমস হাউস পায়নি। তার দাবি, ভোমরায় কাস্টমস হাউস স্থাপনের পর সেখানে গাড়ির সংখ্যা প্রায় চার গুণ বেড়েছে। সোনামসজিদেও কাস্টমস হাউস হলে গাড়ির সংখ্যা চার থেকে পাঁচ গুণ বাড়তে পারে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, রাজস্ব আদায়ের দিক থেকে সোনামসজিদ স্থলবন্দর একসময় বেনাপোলের পর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। ভৌগোলিক কারণ ও নেতৃত্বের কারণে এখানকার রাজস্ব কমছে এবং বন্দরটি ব্যর্থতার দিকে যাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তার মতে, সোনামসজিদ এলাকায় কাস্টমস কর্মকর্তাদের আবাসন না থাকাও বড় সমস্যা। কর্মকর্তারা শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী থেকে যাতায়াত করেন। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বন্দর চালু থাকার কথা থাকলেও এখানে কর্মকর্তারা সকাল ৯টা, ১০টা বা ১১টার দিকে আসেন এবং সড়কপথে নিরাপত্তার কারণে বিকেল ৪টার পর দ্রুত ফেরার প্রস্তুতি নেন বলে তিনি জানান।
আব্দুল ওয়াহেদ আরও বলেন, অন্যান্য বন্দরে ফলের গাড়িতে ছাড় দেওয়া হলেও সোনামসজিদে কাস্টমস তা অনুসরণ করে না এবং অসহযোগিতা করে। রাজশাহীর কাস্টমসের যে কাঠামো রয়েছে, সেটি সোনামসজিদে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সহায়ক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বন্দরসংক্রান্ত সমস্যা ও ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করতে সরকার সীমান্ত বাণিজ্য কমিটি গঠন করেছে এবং দুই মাস পরপর ওই কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও রাজশাহী কাস্টমস কমিশনার এসব বৈঠক ঠিকমতো করেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার মতে, অন্যান্য বন্দরের সুযোগ-সুবিধা সোনামসজিদেও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি জানান, কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য ৩২০ কোটি টাকার ‘সাসেক’ নামের একটি প্রকল্প একনেকে আটকে আছে বা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে সোনামসজিদের অবকাঠামো ও কাস্টমস হাউসসহ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো এর আওতায় আসবে। তার দাবি, এসব অবকাঠামো তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বন্দরের রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব হবে না।
একই সঙ্গে অবৈধভাবে ব্যবসার চেষ্টা থেকে সরে এসে বৈধ পথে ব্যবসা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন আব্দুল ওয়াহেদ। এ জন্য বিজিবি, কাস্টমস, এনএসআই, ডিজিএফআই, আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, এভাবে কাজ করা গেলে সোনামসজিদ স্থলবন্দরের ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানো সম্ভব।
সোনামসজিদ স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা রাজু মিয়া জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরটি থেকে ৮১৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আদায় হয়েছিল ৯০৯ কোটি টাকা। দুই অর্থবছরের মধ্যে রাজস্ব আদায়ের ব্যবধান প্রায় ৯০ কোটি টাকা, যা শতকরা হিসাবে ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ ঘাটতি।
রাজু মিয়ার ভাষ্য, রাজস্ব কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। আমদানি কমে যাওয়া এবং আমদানি শুল্ক কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে রাজস্ব ঘাটতি হয়। আগে সোনামসজিদ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি হলেও নানা কারণে কিছু পণ্যের আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়েও এর প্রভাব পড়েছে।
ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতার কারণে রাজস্ব কমেছে, এমনটি বলা যাবে না উল্লেখ করে রাজু মিয়া বলেন, তবে বন্দরে নজরদারি বেড়েছে। কমিশনারের নির্দেশনা অনুযায়ী যারা সঠিকভাবে ও সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবসা করছেন, তাদের স্বাগত জানানো হচ্ছে। ভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যবসা করতে চাওয়া ব্যক্তিদের সেই সুযোগ কমে যাওয়ায় রাজস্বে প্রভাব পড়তে পারে। তবে তার দাবি, বর্তমানে সোনামসজিদ স্থলবন্দরে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ রয়েছে এবং সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবসায়ীরা কার্যক্রম চালাতে পারছেন।

মতামত